ঢাকা ০১:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চার দশকের শিক্ষাসেবার স্বীকৃতি, ভালোবাসায় বিদায় জানালেন শিক্ষার্থীরা

দীর্ঘ ৪০ বছরের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন দুধবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার প্রবীণ শিক্ষক মাওলানা মনিরুজ্জামান। তাঁর অবসর উপলক্ষে আয়োজিত বিদায়ী সংবর্ধনা ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়। শিক্ষককে ঘিরে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশে অনুষ্ঠানের বিভিন্ন মুহূর্তে উপস্থিত শিক্ষার্থী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অতিথিদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল ১০টায় দুধবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো প্রাঙ্গণ প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে। বহু বছর পর প্রিয় শিক্ষকের সান্নিধ্যে এসে স্মৃতিচারণায় মেতে ওঠেন তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থী।

পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আব্দুল মতিন এবং সঞ্চালনা করেন ক্রীড়া শিক্ষক শামসুজ্জামান বাবু।

স্বাগত বক্তব্যে মাদ্রাসার সুপার আব্দুল জব্বার বলেন, “একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি একটি প্রজন্ম গড়ে তোলেন। মাওলানা মনিরুজ্জামান চার দশক ধরে নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন।”

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সহকারী সুপার মাওলানা মেহেদী হাসান, ইংরেজি শিক্ষক সাইফুল ইসলাম, কৃষি শিক্ষক হাফিজুর রহমান, গণিত শিক্ষক আক্কাস, আনিসুর রহমান, আরবি শিক্ষক আমেনা ও খোদেজা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক, তৌহিদুল ইসলাম, আবু বকর সিদ্দিক, নুরুল ইসলাম এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান, বাইজিদসহ অনেকে।

বক্তারা বলেন, মাওলানা মনিরুজ্জামানের হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, শিক্ষক, প্রশাসনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে শিক্ষার্থী ভর্তি ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অর্থ সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর অবদান শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে রয়েছে।

তাঁরা আরও বলেন, “একজন আদর্শ শিক্ষক সমাজের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কর্ম, চরিত্র ও আত্মনিবেদনের মাধ্যমে মাওলানা মনিরুজ্জামান সেই মর্যাদা অর্জন করেছেন। তাঁর মতো শিক্ষকেরা জাতির নৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করেন এবং আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকেন।”

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে যখন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রিয় শিক্ষকের হাতে সম্মাননা স্মারক ও উপহার তুলে দেন। এ সময় আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত অনেকেই।

ভালোবাসা ও সম্মান গ্রহণ করে অশ্রুসিক্ত নয়নে মাওলানা মনিরুজ্জামান বলেন, “আমি কোনোদিন ভাবিনি, আমার শিক্ষার্থীরা আমাকে এতটা ভালোবাসবে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন তোমাদের ভালোবাসা ও দোয়া।”

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ স্মরণ করেন তাঁর কঠোর শাসনের কথা, আবার কেউ তুলে ধরেন পিতৃতুল্য স্নেহ ও মমতার স্মৃতি। সবার কণ্ঠে ছিল একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।

দীর্ঘ ৪০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে মাওলানা মনিরুজ্জামান শুধু কুরআন, আরবি ও ফিকাহ শিক্ষা দেননি; তিনি গড়ে তুলেছেন অসংখ্য সৎ, আদর্শবান ও দ্বীনদার মানুষ। তাঁর অবসরের মধ্য দিয়ে দুধবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও অবদান শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।

ট্যাগঃ
জনপ্রিয়

চার দশকের শিক্ষাসেবার স্বীকৃতি, ভালোবাসায় বিদায় জানালেন শিক্ষার্থীরা

চার দশকের শিক্ষাসেবার স্বীকৃতি, ভালোবাসায় বিদায় জানালেন শিক্ষার্থীরা

সর্বশেষ আপডেট : ০২:৩৩:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

দীর্ঘ ৪০ বছরের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন দুধবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার প্রবীণ শিক্ষক মাওলানা মনিরুজ্জামান। তাঁর অবসর উপলক্ষে আয়োজিত বিদায়ী সংবর্ধনা ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়। শিক্ষককে ঘিরে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশে অনুষ্ঠানের বিভিন্ন মুহূর্তে উপস্থিত শিক্ষার্থী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অতিথিদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল ১০টায় দুধবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো প্রাঙ্গণ প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে। বহু বছর পর প্রিয় শিক্ষকের সান্নিধ্যে এসে স্মৃতিচারণায় মেতে ওঠেন তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থী।

পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আব্দুল মতিন এবং সঞ্চালনা করেন ক্রীড়া শিক্ষক শামসুজ্জামান বাবু।

স্বাগত বক্তব্যে মাদ্রাসার সুপার আব্দুল জব্বার বলেন, “একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি একটি প্রজন্ম গড়ে তোলেন। মাওলানা মনিরুজ্জামান চার দশক ধরে নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন।”

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সহকারী সুপার মাওলানা মেহেদী হাসান, ইংরেজি শিক্ষক সাইফুল ইসলাম, কৃষি শিক্ষক হাফিজুর রহমান, গণিত শিক্ষক আক্কাস, আনিসুর রহমান, আরবি শিক্ষক আমেনা ও খোদেজা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক, তৌহিদুল ইসলাম, আবু বকর সিদ্দিক, নুরুল ইসলাম এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান, বাইজিদসহ অনেকে।

বক্তারা বলেন, মাওলানা মনিরুজ্জামানের হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, শিক্ষক, প্রশাসনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে শিক্ষার্থী ভর্তি ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অর্থ সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর অবদান শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে রয়েছে।

তাঁরা আরও বলেন, “একজন আদর্শ শিক্ষক সমাজের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কর্ম, চরিত্র ও আত্মনিবেদনের মাধ্যমে মাওলানা মনিরুজ্জামান সেই মর্যাদা অর্জন করেছেন। তাঁর মতো শিক্ষকেরা জাতির নৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করেন এবং আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকেন।”

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে যখন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রিয় শিক্ষকের হাতে সম্মাননা স্মারক ও উপহার তুলে দেন। এ সময় আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত অনেকেই।

ভালোবাসা ও সম্মান গ্রহণ করে অশ্রুসিক্ত নয়নে মাওলানা মনিরুজ্জামান বলেন, “আমি কোনোদিন ভাবিনি, আমার শিক্ষার্থীরা আমাকে এতটা ভালোবাসবে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন তোমাদের ভালোবাসা ও দোয়া।”

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ স্মরণ করেন তাঁর কঠোর শাসনের কথা, আবার কেউ তুলে ধরেন পিতৃতুল্য স্নেহ ও মমতার স্মৃতি। সবার কণ্ঠে ছিল একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।

দীর্ঘ ৪০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে মাওলানা মনিরুজ্জামান শুধু কুরআন, আরবি ও ফিকাহ শিক্ষা দেননি; তিনি গড়ে তুলেছেন অসংখ্য সৎ, আদর্শবান ও দ্বীনদার মানুষ। তাঁর অবসরের মধ্য দিয়ে দুধবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও অবদান শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।